আইন উপদেষ্টা
ভোট না দেয়ার আক্ষেপ এবার দূর হবে

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন আছে। ভোট দিতে না পারার এ আক্ষেপ আর থাকবে না। আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। আমরা এটা নিশ্চিত করার জন্যই রাতদিন কাজ করছি।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের গত এক বছরে আইন মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ ও কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরা হয় এ সংবাদ সম্মেলনে। এসময় আইন উপদেষ্টা দেশের সমসাময়িক পরিস্থিতি, আগামী জাতীয় নির্বাচন এবং জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকারের বিষয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
একজন সাংবাদিক আইন উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, গত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে কেন্দ্রে যাইনি। ২০০৮ সালে কেন্দ্রে গিয়ে শুনি ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। এমন অবস্থা আমার মতো এখানে উপস্থিত সবারই। আগামী নির্বাচনে আমরা ভোট দিতে পারবো কি না? সুষ্ঠু ভোটের আয়োজনে আপনাদের উদ্যোগটা কী? এমন প্রশ্নের জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমাদের হেন উদ্যোগ নেই, যা নেওয়া হচ্ছে না। ভোটাধিকারের কথা বলছেন? ক্লাসে যখন যেতাম। শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করতাম- আপনাদের মধ্যে কে কে ভোট দিয়েছেন- ভোটের কথা শুনলেই তারা হাসাহাসি শুরু করতেন। কেউ কেউ বলতেন স্যার ভোট দিয়েছি, তবে ১০/১২টা। ৯০ শতাংশ বলতেন তারা ভোট দেননি। যাই হোক আমাদের সেই দুঃখ ঘুচবে। ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন করার জন্যই আমরা কাজ করছি। প্রধান উপদেষ্টাও জাতির কাছে এ অঙ্গীকার করেছেন।
কবে নাগাদ নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, আর কয়েকটি দিন অপেক্ষা করুন। প্রধান উপদেষ্টা কিছুদিনের মধ্যে এ ঘোষণা দেবেন।
মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরে আইন উপদেষ্টা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার অসীম আত্মত্যাগের উপর দাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের গত এক বছরে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। আইনি সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারকে আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি।
আইন উপদেষ্টা বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩, সংশোধন করে আইনটিকে ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। এই আইনে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, অভিযুক্তের অধিকার সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং বিচার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী আপিল, সাক্ষী নিরাপত্তা এবং ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থাও প্রবর্তিত হয়েছে। অধ্যাদেশ জারি করে স্বতন্ত্র জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে মেধা, সুযোগের সমতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, আমরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাথে যৌথভাবে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে পূর্বের সাইবার নিরাপত্তা আইনের নিপীড়নমূলক ধারাগুলো এবং এসবের অধীনে দায়ের হওয়া মামলাগুলো বাতিল করেছি।
হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার বিষয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, জেলা পর্যায়ে গঠিত কমিটি এবং আইন ও বিচার বিভাগ কর্তৃক এজাহার, চার্জশিটসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনার পর ১৫ হাজারের বেশি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার আইনের অধীনে ৪০৮ টি স্পিচ অফেন্স সংক্রান্ত মামলা, এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে দায়ের করা ৭৫২ টি হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব মামলা প্রত্যাহারের কারণে কয়েক লক্ষ রাজনৈতিক নেতা, কর্মী ও স্বাধীন মতের মানুষ হয়রানী থেকে রেহাই পেয়েছে।
তিনি বলেন, গত এক বছরে মন্ত্রীপর্যায়ে নিষ্পত্তিকৃত নথির সংখ্যা ১২৮৩টি, বিগত সরকারের একই সময়ে ৮৩৪ টি নথি নিষ্পত্তি হয়েছিল। গত এক বছরে আইন মন্ত্রণালয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগসহ অন্যান্য দপ্তরে ৩৯১টি বিষয়ে আইনি মতামত প্রদান করেছে (গত সরকারের আমলে ১৮০টি)। এসময়ে সনদ, অ্যাফিডেভিট, দলিলসহ ৩৬ ধরনের মোট এক লাখ ৫৯ হাজার ৫৪৪টি ডকুমেন্ট সত্যায়ন হয়েছে যা আগের তুলনায় দ্বিগুণ।
তিনি বলেন, এছাড়া জুলাই গনঅভ্যুত্থানের পর ফ্যসিষ্ট আমলে নিয়োগকৃত সকল আইন কর্মকর্তা পালিয়ে যাওয়ার কারণে গত একবছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক আইন কর্মকর্তাকে নিয়োগ করতে হয়েছে। সারাদেশের বিভিন্ন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে চার হাজার ৮৮৯ জন সরকারি আইন কর্মকর্তা এবং অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে ২৭৪ জন এটর্নীকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক ও প্রসিকিউটর নিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগে পাঁচজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগে ২৩ জন বিচারপতি নিয়োগে সাচিবিক সহায়তা দেয়া হয়েছে।